পাইলস কি-পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা-পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয়

বর্তমানে অনেকেই পাইলস বা হেমোরয়েড রোগে ভুগছেন। পাইলস বা হেমোরয়েড কে অনেকেই সাধারণ রোগ মনে করেন। কিন্তু আসলে পাইলস বা হেমোরয়েড কোন সাধারণ রোগ নয়। সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা না নিলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি পর্যন্ত হতে পারে।
পাইলস কি-পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা-পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয়
আজকের এই পোস্টে আমরা পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা এবং পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয় সে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। মলদ্বারে যে সকল রোগ হয়ে থাকে তার মধ্যে একটি হলো পাইলস।

পোস্ট সূচিপত্রঃ- পাইলস কি-পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা-পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয়

ভূমিকা

পাইলস বা হেমোরয়েড হলো মলদ্বারের এক ধরনের রোগ। এই রোগকে বাংলায় অর্শ্বরোগ বলা হয়। বর্তমানে এই রোগটির কারণে মানুষ অনেক সমস্যায় ভুগে থাকেন। মানুষের খাদ্যাভাসের পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত জীবন যাপন এর কারণে এই রোগটি বেশি হয়ে থাকে। মলদ্বারে রোগ গুলোর মধ্যে এটি একটি জটিল রোগ। পাইলস হলে মলদ্বারের ভিতরে রক্ত জমাট বেঁধে তা নিচের দিকে নেমে আসে। সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে এই রোগের সৃষ্টি হয়।
পুরনো ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ফলে মলদ্বারে যে চাপের সৃষ্টি হয় এর ফলে মলদ্বারের শিরা ফুলে নিচের দিকে নেমে আসে এটিকেই আমরা পাইলস বলে থাকি। পাইলস হলে ব্যথা না থাকলেও প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই পাইলস ভালো করা সম্ভব। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করলে খুব সহজেই এই রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।

পাইলস কি

পাইলস কে বলা হয় অর্শ্বরোগ। এটি মূলত মলদ্বারের একটি জটিল রোগ। মলদ্বারে অবস্থিত শিরা গুলো ফুলে যাওয়ার কারণে পাইলস হয়ে থাকে। পাইলস হলে মলদ্বার থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং অসস্তি বোধ হয়। পাইলসের কারণে মলদ্বারের চারপাশ ফুলে যায় এবং অনেক সময় ব্যথা হতে থাকে। সাধারণত খাদ্যাভ্যাসের অভাবে এবং জীবন যাত্রার পরিবর্তনের কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে। ডাক্তারি পরিভাষায় বৃহদান্ত্রের শেষাংশে রেকটামের ভিতরে এবং বাইরে কিছু রক্তশিরার জালিকা থাকে যেগুলো প্রয়োজন মতো সংকুচিত এবং প্রসারিত হতে পারে। এই রক্তশিরা গুলোতে প্রদাহের সৃষ্টি হলে তাকে আমরা পাইলস বলে থাকি। অনেক সময় পাইলস মলদ্বারে বের হয়ে আসে এবং রক্তক্ষরণ হতে থাকে।

পাইলস কেন হয়

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভাসের কারণেই পাইলস হয়ে থাকে। আমরা বেশি পরিমাণে তৈলাক্ত খাবার এবং আমিষ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকি। পাইলস হওয়ার পেছনে মূল কারন হল তৈলাক্ত খাবার এবং মসলা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। এছাড়াও আমরা আঁশ জাতীয় খাবার কম খায়। আঁশ জাতীয় খাবার কম খাওয়ার কারণে আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে।
এবং আস্তে আস্তে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পাইলস হয়ে থাকে। পাইলস হওয়ার আরো কিছু কারণ হলো কায়িক পরিশ্রম না করা, অতিরিক্ত মোটা হওয়া, আঁশ জাতীয় খাবার কম খাওয়া, পুরনো ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এবং জেনেটিক সমস্যা ইত্যাদি।

পাইলসের প্রকারভেদ

পাইলসের ধরন অনুযায়ী পাইলস কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ পাইলস এবং বাহ্যিক পাইলস।
পাইলস কি-পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা-পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয়
চিত্রঃ অভ্যন্তরীণ পাইলস ও বাহ্যিক পাইলস (Internal & External Hemorrhoids)

অভ্যন্তরীণ পাইলসঃ

অভ্যন্তরীণ পাইলস সাধারণত মলদ্বারের ভেতরের দিকে থাকে। এই ধরনের পাইলসের লক্ষণ হল মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হয় এবং মলদ্বার বের হয়ে আসে। সাধারণত অভ্যন্তরীণ পাইলস হলে ব্যথা হয় না। যদি পাইলস বাইরের দিকে বের হয়ে আসে এবং তা ভেতরে ঢোকাতে সমস্যা হয় তাহলে মলদ্বারে ব্যথা অনুভূত হয়।

বাহ্যিক পাইলসঃ

বাহ্যিক পাইলস সাধারণত মলদ্বারের মুখে এবং বাইরের দিকে হয়ে থাকে। এই ধরনের পাইলস সাধারণত চামড়ার নিচে হয়ে থাকে এবং কোনরকম ব্যথা অনুভূত হয় না। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিলে মলদ্বারের কাছে রক্ত জমাট বেঁধে ব্যথা হতে পারে।
যদি কোন কারনে এই পাইলস ফেটে যায় তাহলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। দীর্ঘদিন যাবত বাহ্যিক পাইলস হয়ে থাকলে আক্রান্ত স্থানে চুলকানি এবং ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় মলদ্বার পরিষ্কারের ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

পাইলসের লক্ষণ

পাইলসের লক্ষণগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি হলো বাহ্যিক পাইলসের লক্ষণ এবং অন্যটি অভ্যন্তরীণ পাইলসের লক্ষণ। নিচে পাইলসের লক্ষণ গুলো আলোচনা করা হলো।

বাহ্যিক পাইলসের লক্ষণঃ

  • মলদ্বারে চারপাশে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া হয়।
  • মলদ্বারের চারপাশে ফুলে যায়।
  • শক্ত জায়গায় বসলে চাপ লেগে ব্যথা লাগে।
  • মলত্যাগের সময় ব্যথা হতে পারে।
  • মলত্যাগের সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • পায়ুপথে ব্যথার কারণে অস্বস্তি বোধ হতে পারে।
  • মলদ্বারের কাছে মাংসল প্রদাহ হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ পাইলসের লক্ষণঃ

  • মলত্যাগের সময় কোন ব্যথা ছাড়া প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • মলত্যাগের সময় প্রচন্ড ব্যথা এবং অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হতে পারে।
  • মাটিতে বসতে গেলে অনেক সময় চাপ লাগার ফলে ব্যথা অনুভূত হয়।
  • মলত্যাগের সময় মলদ্বার খোলা অবস্থায় ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া করতে পারে।

পাইলস হলে কি কি সমস্যা হতে পারে

যেহেতু পাইলস মলদ্বারের একটি জটিল রোগ তাই পাইলস হলে মলত্যাগ করতে মানুষের অনেক সমস্যা হতে পারে। পাইলস হলে কি কি সমস্যা হতে পারে? এই বিষয়টি নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
  • মলত্যাগের সময় অথবা মলত্যাগ ছাড়াও মলদ্বার দিয়ে রক্ত যেতে পারে।
  • অনেক ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় মলদ্বার নিচের দিকে নেমে আসতে থাকে। তখন হাত দিয়ে ভিতরের দিকে ঢুকিয়ে দিতে হয় অথবা নিজে ভিতরে চলে যায়।
  • পাইলসের কারণে মলদ্বারে ব্যথা হতে পারে।
  • পাইলস হলে আরেকটি সমস্যা হতে পারে তা হলো মলদ্বার জ্বালাপোড়া করা।
  • অনেক সময় মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হয় এবং মলের সাথেও রক্ত যেতে পারে।
  • পাইলস হলে পায়ুপথে বা মলদ্বারে চুলকানি অনুভূত হতে পারে।
  • পাইলস হলে আর একটি সমস্যা হয় আর তা হলো মলদ্বারের চারপাশে শক্ত ভাব হয়ে যায়।
  • অনেক সময় পাইলসের কারণে ব্যথাহীন ভাবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
  • পাইলস হলে মলদ্বার দিয়ে পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়ে আসে।
  • পাইলস হলে মলদ্বারে রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং মলদ্বারে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
  • শক্ত বা মাটিতে বসতে অস্বস্তি বোধ হয় এবং বসার সময় মলদ্বার ব্যথা করে।
  • পাইলসের কারণে মলদ্বারের কাছে মাংসল প্রদাহ দেখা যায় এবং মলত্যাগ করতে অস্বস্তি বোধ হয়।
  • পাইলস হলে মলদ্বারের কাছে ফুলে যায় এবং অতিরিক্ত ফলার কারণে মলদ্বার পরিষ্কার করতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।

পাইলস এর ওষুধ

পাইলস রোগের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করতে হবে। আপনি যখন একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন তখন প্রথমে আপনাকে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভাস এবং লাইফ স্টাইলের কারণে আমরা এ রোগের সম্মুখীন হই। যদি ঘরোয়া পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে চিকিৎসক আপনাকে ট্রিটমেন্ট হিসেবে অপারেশন করতে বলতে পারে। বর্তমানে পাইলসের চিকিৎসার জন্য পাইলোস্প্রে নামে একটি স্প্রে বের করা হয়েছে। এই স্প্রে টি পাইলসের চিকিৎসার জন্য অনেক কার্যকর। এই স্প্রে ব্যবহার করা অনেক সহজ এবং স্প্রে টি ব্যবহার করলে অস্বস্তি বা ব্যথা কম হয়। তবে পাইলোস্প্রে ব্যবহার করার জন্য অবশ্যই আপনাকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

শেষ কথা

প্রিয় পাঠক আজকের এই পোস্ট থেকে আপনারা জানতে পারলেন পাইলস কি-পাইলস এর লক্ষণ ও চিকিৎসা-পাইলস হলে কি কি সমস্যা হয়। পাইলস রোগের কারণে আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেহেতু এই রোগটি অনিয়মিত খাদ্যাভাস এবং পরিবর্তন জীবন যাপনের কারণে হয়ে থাকে।তাই খাদ্যাভাসের পরিবর্তন এবং সুশৃংখল জীবন যাপনের মাধ্যমে পাইলস রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আজকের পোস্টটি পড়ে যদি আপনার উপকার হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই পোস্টটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন।

আপনার সচরাচর জিজ্ঞাসা

পাইলস এর লক্ষণ গুলো কি কি?
  • মলদ্বারে চারপাশে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া হয়।
  • মলদ্বারের চারপাশে ফুলে যায়।
  • শক্ত জায়গায় বসলে চাপ লেগে ব্যথা লাগে।
  • মলত্যাগের সময় ব্যথা হতে পারে। মলত্যাগের সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে।
পাইলস কি ভালো হয়?

পাইলসের চিকিৎসা সাধারণত এর তীব্রতার উপর নির্ভর করে । প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরোয়া চিকিৎসা এবং ওষুধ সেবনের মাধ্যমে চিকিত্সা গ্রহন করা যেতে পারে। তবে, পাইলসের লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পাইলসকে নির্মূল করার জন্য অস্ত্রোপচার করা ভাল।

পাইলস কেন হয়?

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভাসের কারণেই পাইলস হয়ে থাকে। আমরা বেশি পরিমাণে তৈলাক্ত খাবার এবং আমিষ জাতীয় খাবার খেয়ে থাকি। পাইলস হওয়ার পেছনে মূল কারন হল তৈলাক্ত খাবার এবং মসলা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। এছাড়াও আমরা আঁশ জাতীয় খাবার কম খায়। আঁশ জাতীয় খাবার কম খাওয়ার কারণে আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে।

পাইলস হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।

পাইলসের লক্ষণ দেখাদিলে অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার, লবণাক্ত খাবার, দুগ্ধজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও তেলে ভাজা খাবার, লাল মাংস, অ্যালকোহল, কফি ও চা খাওয় থেকে বিরত থাকুন এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পাইলস হলে কি মানুষ মারা যায়?

পাইলস হলেই মানুষ মারা যাবে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু যথা সময়ে সঠিক চিকিৎসা না নিলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Timeline Treasures নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url