জীববৈচিত্র্য কাকে বলে-জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও উপায়

জীববৈচিত্র্য বলতে আমাদের পৃথিবীর পরিবেশে বিদ্যমান জড় ও জীব জিনিসকে বোঝানো হয়। এখানে রয়েছে বহু রকমের জীব ও অজস্র রকমের জড় পদার্থের সমাহার। কত ধরনের জীব আছে আমাদের এই পৃথিবীতে?
জীববৈচিত্র্য কাকে বলে-জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও উপায়
এর সঠিক হিসেব দেওয়া খুব কঠিন, তবে প্রজাতি (যাদের দৈহিক ও জনন সংক্রান্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পারস্পরিক সাদৃশ্যযুক্ত এবং যারা একই পূর্বপুরষ হতে উদ্ভূত)-এর হিসেবে একে উপস্থাপন করা অনেকটা সহজতর।

সূচিপত্রঃ

জীববৈচিত্র্য কাকে বলে

পৃথিবীতে প্রায় ১৫ লক্ষ প্রজাতির বর্ণনা ও নামকরণ পাওয়া যায়। প্রতিটি প্রজাতি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য দিয়ে যেকোনো একটি প্রজাতি অন্যসব প্রজাতি থেকে ভিন্ন ও শনাক্তকরণযোগ্য। যেমন কাঁঠাল একটি প্রজাতি এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে একে অন্যান্য প্রজাতি থেকে পৃথক করা সম্ভব।
জীবদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকার কারণেই জীব জগৎকে লক্ষ লক্ষ প্রজাতিতে বিভক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আবার মানুষ একটি প্রজাতি। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় সাতশ কোটি মানুষের বাস। এরা সবাই হুবুহ্ণ একই রকম নয়, কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যে এরা পরস্পর পৃথক। অর্থাৎ একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের মধ্যেও বৈচিত্রা থাকে। তাই সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায় পৃথিবীতে বিরাজমান জীব সমূহের প্রাচুর্য ও ভিন্নতাই হলো জীববৈচিত্র্য (Biodiversity)।

জীববৈচিত্র্যের প্রকারভেদ

জীববৈচিত্র্যকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(১) প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species diversity)
(২) বংশগতীয় বৈচিত্র্য (Gesenical diversity)
(৩) বাসস্থতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem diversity)

প্রজাতিগত বৈচিত্র্য

প্রজাতিগত বৈচিত্রা বলতে সাধারণত পৃথিবীতে বিরাজমান জীবসমূহের মোট প্রজাতির সংখ্যাকেই বুঝায়। কারণ, পৃথকযোগ্য বৈশিষ্ট্যেই এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতি ভিন্নতর। যেমন- বাঘের সাথে হরিনের আকার, সাভাব, হিংস্রতা, সংখ্যা বৃদ্ধির ধরণ ভিন্ন হয়ে থাকে। এক প্রজাতির সাথে অন্য প্রজাতির বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নতাই প্রজাতিগত বৈচিত্র্য।

বংশগতীয় বৈচিত্র্য

একই প্রজাতিভুত্ব সদস্যগণের মধ্যেও অনেক বিষয়ে পার্থক্য দেখা যায়। যেমন একই প্রজাতি কিন্তু তাদের গড়ন, আকত, রোগ-প্রতিরোধ ও পরিবেশ প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা ভিন্ন। এই পার্থক্যগুলো তৈরি হয় তাদের জিন সংগঠনের সামান্য বৈচিত্রোর কারণে। কারণ জিনের মাধ্যমেই জীবের বংশগতীয় বৈশিষ্ট্য বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। প্রত্যেক বৈশিষ্ট্যের জন্য নির্দিপ্ত জিন থাকে। বিভিন্ন কারণে এই জিনের গঠন ও বিন্যাসের পরিবর্তন। হয়ে জীবের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয় এবং নতুন প্রজাতির উদ্ভব হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় জীবের মধ্যে যে বৈচিত্র্য ঘটে, একেই বলা হয় বংশগতীয় বৈচিত্রা।

ব্যস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র

একটি বাসতুতন্ত্রের ভৌত উপাদান, রাসায়নিক উপাদান ও জৈবিক উপাদানগুলোর মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন দেখা দিলে সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে। এসব পরিবর্তন অবশ্যই ধীর ও গৃারাবাহিক। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য সেখানে বসবাসরত জীবের মধ্যেও পরিবর্তন সাধিত হয়। ফলে যে জীববৈচিত্রোর সৃষ্টি হয় তাকেই বলা হয় বাসতুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য। একটি ছোট পুকুরের বাস্তুতন্ত্রে যে সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসতি গড়ে উঠে তা নদীর বাসস্থতশত্র থেকে ভিন্নতর। বন, তৃণভূমি, হ্রদ, নদী, জলাভূমি, পাহাড়, সাগর, মরুষ্টুমি প্রভৃতি বাস্তুতন্ত্রে গড়ে উঠে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ এক একটি জীব সম্প্রদায়।

বাসস্থতন্ত্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের প্রভাব

পরিবেশের উপাদানসমূহ পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কযুক্ত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সবার্থেই এই জটিল সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক জীবের তৎপরতার মধ্য দিয়ে পরিবেশে এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবেশের কেবলমাত্র একটি বিশেষ প্রজাতির বিলুপ্তি বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সে কারণে পরিবেশ স্থিতিশীল রাখার জন্য জীববৈচিত্র্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশের যেসব জীব বা প্রাণীকে এক সময় অপ্রয়োজনীয় ও অবাঞ্ছিত মনে করা হতো সময়ের বিবর্তনে দেখা গেছে সেগুলোই পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের চেকপিক উপকূলে ছিল অসংখ্য বিনকে। সেগুলো মাত্র তিনদিনে পরিশুদ্ধ করতে পারত গোটা এলাকার পানি। কিনতু এখন সেই ঝিনুকের শতকরা ৯৯ তাল বিলুপত হয়ে গেছে। ফলে অবশিষ্ট ঝিনুকেরা এখন এক বছরেও ঐ পানি পরিশুদ্ধ করতে পারে না। এতে ঐ উপকূলের পানি ক্রমশই কর্দমাক্ত হচ্ছে এবং পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙ একদিনে তার ওজনের সমপরিমাণ পোকা-মাকড় খেতে পারে। এই পোঁকা-মাকড় আমাদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। কিন্তু নানা ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ব্যাঙ। পাখিদের প্রধান খাদ্যই কীটপতঙ্কা। এর মধ্যে মানুষ ও ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্কাই বেশি। তাছাড়া পরাগায়নের ক্ষেত্রেও পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পেঁচা, ঈগল, চিল ও বাজপাখিকে আমরা শিকারি প্রজাতি বলে জানি। এরা ইঁদুর খেয়ে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রনে রাখে। মানুষের বসতবাড়িতে বসবাসকারী একজোড়া ইঁদুর বিনা বাধায় বংশ বিস্তার করলে বছর শেষে ইঁদুরের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮৮০ টিতে। কিন্তু একটি পেঁচা দিনে কমপক্ষে তিনটি ইদুর খেয়ে হজম করতে পারে। শকুন, চিল ও কাক প্রকৃতির জঞ্জাল সাফ না করলে রোগজীবাণুতে সয়লাব হয়ে যেত পৃথিবী। সে কারণে কোনো জীবকেই অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। পরিবেশ থেকে কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হলে বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বিভিন্ন জীবের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া, আন্তঃনির্ভরশীলতা ও পরিবেশের ভারসাম্যতা

সাধারণত সবুজ উদ্ভিদকে স্বনির্ভর বলা হয়, কারণ তারা স্বভোজী (Autotrophic), কিন্তু পরিবেশতাত্ত্বিক দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, সবুজ গাছপালাসহ কোনো জীবই স্বনির্ভর নয়। গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতফা ও অন্যান্য জীবজন্তু একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত। একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ পর-পরাগায়নের জন্য (Cross pollination) কীট-পতঙ্গের উপর এবং বীজ বিতরণের জন্য পশুপাখির উপর নির্ভরশীল।

প্রাণিকুল শ্বসনক্রিয়া দ্বারা যে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) গ্যাস ত্যাগ করে সবুজ উদ্ভিদকুল সালোকসংশ্লেষণের জন্য তা ব্যবহার করে। আবার সবুজ উদ্ভিদ দিবাভাগে যে অক্সিজেন (O2) গ্যাস ত্যাগ করে শ্বসনের জন্য প্রাণীকুল তা ব্যবহার করে। তাছাড়া ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও বিভিন্ন প্রকার জীবাণু যারা গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্ক। বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়। এক কথায় বলা যায় যে, পারস্পারিক সংযোগ ও নির্ভরশীলতাই জীবনক্রিয়া পরিচালনার চাবিকাঠি। কাজেই জীবজগতে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা ও প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান জৈবিক সম্পর্কগুলোকে সহ-অবস্থান (Symbiosis) নামে আখ্যায়িত করা যায়।
আর সম্পর্কযুক্ত জীবগুলিকে সহবাসকারী বা সহ-অবস্থানকারী (Symbionts) বলা হয়। এই সহ-অবস্থানকারী জীবগুলোর মধ্যে যে ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটে তাকে মিথস্ক্রিয়া বলা হয়। উপরের আলোচনা থেকে এটিও পরিষ্কার হয়েছে যে মিথস্ক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী জীবগুলি পরস্পর আন্তঃনির্ভরশীল, কেহই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তবে পরিবেশ বিজ্ঞানী ওডাম (Odum) বলেন যে এই আন্তঃনির্ভরশীল সম্পর্ক দুভাবে হতে পারে। যেমন-
(ক) ধনাত্মক আন্তঃক্রিয়া (Positive interactions) দ্বারা এবং
(খ) ঋণাত্মক আন্তঃক্রিয়া (Negative interactions) দ্বারা।

(ক) ধনাত্মক আন্তঃক্রিয়া (Positive interactions):

যে আন্তঃসম্পর্কে দুটি জীবের একটি অন্যটিকে সহায়তা করে তাকে ধনাত্মক আন্তঃক্রিয়া বলে। এ ক্ষেত্রে সহযোগীদ্বয়ের একটি বা উভয়ই উপকৃত হতে পারে। লাভজনক এ আন্তঃক্রিয়াকে মিউচুয়ালিজম (Mutualism) ও কমেনসেলিজম (Commensalism) নামে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

মিউচুয়ালিজম (Mutualism):

সহযোগীদের উভয়ই একে অন্যের দ্বারা উপকৃত হয়। যেমন, মৌমাছি, প্রজাপতি, পোকামাকড় প্রভৃতি ফুলের মধু আহরণের জন্য ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং বিনিময়ে ফুলের পরাগায়ন ঘটে। অনেক পাখি এবং বাদুড় ফল খেয়ে বাঁচে এবং মল ত্যাগের সাথে ফলের বীজও ত্যাগ করে। এ ভাবে বীজের স্থানান্তর হয় এবং উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে। এ বীজ নতুন গাছ ক. শিমজাতীয় উদ্ভিদের মূলে নডিউল খ. সম্মন্ধেনে মূলও নডিউলের সৃষ্টিতে সাহায্য করে। একটি শৈবাল ও একটি ছত্রাক সহাবস্থান করে যাইবেন গঠন করে।

ছত্রাক বহু থেকে জলীয়বল সপ্তাহ এবং উভয়ের ব্যবহারের জন্য খনিজ লবণ সংগ্রহ করে। জন্মানিতে শৈলে বার তোরোফিলের মাধ্যমে নিজের জলা ও ছত্রাকের জন্য শর্করা জাতীয় খাদ্য প্রস্তুত করে। রইজেন্ডিস (Rhizobium) ব্যাকটেরিয়া সিম জাতীয় উদ্ভিদের (Leguminous plant) শিকড়ে অবস্থান করে দুটি (Nodule) তৈরি করে এবং বায়বীয় নাইট্রোজেনকে সেখানে সংকলন করে। এই নাইট্রোজেন সহযোগী শিম উদ্ভিদকে সরাবরাহ করে এবং বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া সহযোগী উদ্ভিদ থেকে শর্করা জাতীয় খাদ্য পেয়ে থাকে।

কমেনসেনিজম (Commensalism):

এ ক্ষেত্রে সহযোগীসের মধ্যে একজন মাত্র উপকৃত হয়। অন্য সহযোগী সদস্য উপকৃত না হলেও কানও অতিতের হয় না। যেমন, দ্রোহিনী উদ্ভিদ মুলের সাহায্যে নিজেকে মাটিকে আবন্ধ করে এবং খনা বড় উদ্ভিদকে আরোহণ করে উপরে উঠে। এষুণে অন্য বৃক্ষের উপর প্রসারিত হয়ে বেশি পরিমাণে আলো গ্রহণ করে। কাট্রল সয়া খাদের জন্য অতয় সাসকারী উদ্ভিদের উপর নির্ভর করে না এবং তার কোনো ক্ষতিও করে না। পাশ্রয়ী উদ্ভিদ বায়ু থেকে খাসা সরাহ করে, কিন্তু অস্ত্রয়দাতার কোনো ক্ষতি করে না। কিছু শৈবাল অনা উদ্ভিদদেহের মধ্যে মন্ত্রয় নিয়ে বসবাস করে। কিন্তু অস্ত্রয়সাতার কোনো ক্ষতি করে না।

(খ) ঋণাত্মক আন্তঃক্রিয়া

এ ক্ষেত্রে জীবষয়ের একটি বা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঋণাত্মক হস্তারিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন-

শোষন (Exploitation):

এ ক্ষেত্রে একটি জীৎ অন্যা জীবকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিজের অধিকার ভোগ করে। যেমন- স্বর্ণলয়া। স্বর্ণলতা হস্টোরিয়া নামক চোষক অজ্যের মাধ্যমে আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ থেকে তার হাস্য সংগ্রহ করে। কোকিল কখনও পরিশ্রম করে বাসা তৈরি করে না। কাকের বাসায় সে ডিম পাড়ে এবং কাকের দ্বারাই তার ডিম ফোটায়।

প্রতিযোগিতা (Competition):

কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আলো, বাতাস, পানি ও খাদ্যের 'জন্য জীবসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এ প্রতিযোগিতায় সবলরাই টিকে থাকে আর দুর্বলরা বিতাড়িত হয়ে থাকে।

অ্যান্টিবায়োসিস (Antiblosis):

একটি জীব কর্তৃক সৃষ্ট জৈব রাসায়নিক পদার্থের কারণে যদি অনা জীবের বৃদ্ধিস্থ ও বিকাশ আংশিক বা সম্পূর্ণযুগে বাধাপ্রাপ্ত হয় অথবা মৃত্যু ঘটে তখন সেই প্রক্রিয়াকে অ্যান্টিবায়োসিস বলে অণুজীবজগতের এ ধরনের সম্পর্ক অনেক বেশি দেখা যায়।
উপরের আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে পরিবেশে- বিদ্যমান বিভিন্ন জীবের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্রিয়া বিক্রিয়া হচ্ছে এবং প্রত্যেকটি উপাদান পরস্পরের সাথে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। এই সম্পর্ক দ্বারা কেউ লাভবান হচ্ছে আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে। আর এভাবেই তারা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।

জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও উপায়

আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটিকে জীবের বসবাসযোগ্য করে রাখার জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ অপরিহার্য। এই পৃথিবীতে রয়েছে অসংখ্য জীব আর জীবন ধারণের বিভিন্ন উপাদান যেমন মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি। বর্তমান পৃথিবীর অত্যধিক জনসংখ্যার বিভিন্ন ধরনের চাহিদা যেমন- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মেটাতে যেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান। সংকটজনক এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ সচেতন না হয়ে উঠলে বিপর্যয় আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

আমাদের পরিবেশে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বৃহদাকৃতির প্রাণী বা উদ্ভিদ কেহই অবাঞ্চিত বা মূল্যহীন নয়। প্রকৃতির রাজ্যে সকল জীব ও জড় পদার্থ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একে অপরের সাথে কলনে আবন্ধ। লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ, পশু পাখি, কীটপতকা, মানুষ ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছে জীববৈচিত্রা, যার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে মানব জাতির কল্যান ও অস্তিত্ব। অরণ্য, পাহাড়, জলাভূমি, সমুদ্র জীববৈচিত্রোর অতীব প্রয়োজনীয় আধার। কাজেই পরিবেশ সুরক্ষিত থাকলে জীববৈচিত্র্য টিকে থাকবে।

পরিবেশ সুরক্ষিত থাকলে মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ঔষধ, জ্বালানি, পানিসহ প্রয়োজনীয় উপকরনাদি পরিবেশ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যাবে। পরিবেশ ক্ষতিগ্রত হলে বিশেষ করে বনাঞ্চল ধবংস হলে বৃষ্টিপাতের হার কমে যায়, চাষাবাদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। গ্রীন হাউস গ্যাস ( CO2, CO, CH4, N₂O ইত্যাদি) বৃদ্ধি পাবার ফলে তাপমাত্রা বেড়ে যায় যাকে গ্রীনহাউস এফেক্ট (Green houese effect) বলে। গ্রীনহাউস এফেক্ট এর কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাবে ও উপকূল অঞ্চল তলিয়ে যাবে, আবহাওয়ার পরিবর্তন হবে, বনাঞ্চল ধবংস হবে, বিভিন্ন রোগবালাই এর প্রভাবে ফসলের ক্ষতি হবে, ঝড় জলোচ্ছাস এর তীব্রতা বেড়ে যাবে।

পরিবেশ সুরক্ষিত থাকলে গ্রীনহাউস এফেক্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাই এখন থেকেই পরিবেশ সংরক্ষণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। মানুষ বর্তমানে তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে পরিবেশকে সংরক্ষণের কথা জোরেশোরে বলা শুরু করেছে। সুস্থ পরিবেশ রক্ষার জন্য সমগ্র বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি। বৃক্ষরোপনকে শুধুমাত্র মাস বা সপ্তাহে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিন যে গাছ কাটা হবে ঠিক তার দ্বিগুণ গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
কোনো এলাকায় শিল্পকারখানা নির্মাণের পূর্বে সেই এলাকার পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব বিবেচনা করতে হবে এবং শিল্প বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ন করতে হবে। নগরায়নের সাথে অবশ্যই বৃক্ষায়ন করতে হবে। জ্বালানি হিসেবে কাঠের পরিবর্তে সৌরশক্তির ব্যবহার করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে, উপকারী জীবাণু, স্থলজ পোকামাকড় ধ্বংস করে, জলজ ও মাটির বাস্তুতন্ত্রকে নষ্ট করে। কাজেই জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। রসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে।

মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা বিভিন্নভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটায়। জনসংখ্যা সীমিত রেখে সচেতন ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে, পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। প্রচার মাধ্যমকে এ ব্যাপারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রীন হাউস গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ভূমিক্ষয় রোধ করতে প্রচুর পরিমাণে বনায়ন করতে হবে। এতে যেমন জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় রোধ হবে তেমনি ভূমিক্ষয়ও রোধ হবে। নদী খনন করে, এবং প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সংরক্ষণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। এতে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা দূর হবে, পানির বাস্তুতন্ত্র স্বাভাবিক থাকবে।

পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য জীব বৈচিত্রা সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক এবং সেই লক্ষ্যে যে সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে তাদেরকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করতে হবে। বায়ু দূষন, পানি দূষন, মাটি দূষন, শব্দ দূষন যাতে না হয় সে রকম সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতিকে যথার্থভাবে অনুসরণ করতে হবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Timeline Treasures নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url